October 26, 2020, 1:47 am

ধরাছোঁয়ার বাইরে রাঘব বোয়ালরা! নৌ খাতের কর্মকর্তারা দুদক আতঙ্কে

এক কর্মকর্তাকে ঘুষসহ গ্রেফতার, আরেকজনের সম্পদের হিসাব তলব, বিআইডব্লিউটিএর সিবিএ নেতাদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং এনএমআই অধ্যক্ষকে দুদক তলব করায় আতঙ্ক বেড়েছে

নৌপরিবহন খাতের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে বেশ কিছুদিন ধরে দুদক আতঙ্ক বিরাজ করছে। সম্প্রতি নৌপরিবহন অধিদফতরের এক কর্মকর্তাকে ঘুষসহ গ্রেফতার, আরেক কর্মকর্তার সম্পদের হিসাব তলব, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) সিবিএ নেতাদের দফায় দফায় ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ এবং কিছুদিন আগে ন্যাশনাল মেরিটাইম ইনস্টিটিউটের (এনএমআই) অধ্যক্ষকে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) তলব করায় এ আতঙ্ক আরও বেড়ে গেছে। তবে দুর্নীতির অভিযোগ থাকলেও এ খাতের শীর্ষ স্থানীয় পর্যায়ের কর্মকর্তারা এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, দুদক ইতোমধ্যে কয়েকটি বিষয়কে প্রকাশ্য অনুসন্ধানের আওতায় এনেছে। এগুলো হলো নৌপরিবহন অধিদফতরের বিভিন্ন কার্যালয়ে অভ্যন্তরীণ নৌযানের ভৌতিক সার্ভে ও সার্ভে বাবদ মোটা অঙ্কের অর্থ লেনদেন, অধিদফতরের প্রধান কার্যালয়ে প্রতিটি জাহাজের নকশা অনুমোদনের ক্ষেত্রে ১০ লাখ থেকে ২০ লাখ টাকা ঘুষ লেনদেন, সমুদ্রগামী জাহাজের নাবিক পরীক্ষায় অর্থ লেনদেন, ছুটি নিয়ে এনএমআই’র অধ্যক্ষর কয়েক মাস বিদেশি জাহাজে চাকরি করা এবং বিআইডব্লিউটিএর সিবিএ সভাপতি, কার্যকরী সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও কোষাধ্যক্ষর বিরুদ্ধে উত্থাপিত নানা অনিয়মের অভিযোগ। এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িত অভিযোগে তিনজন ইতোমধ্যে গ্রেফতার হয়েছেন। সংশ্লিষ্ট অন্য কর্মকর্তাদেরও ইতোমধ্যে চিঠি পাঠিয়ে তাদের সম্পদের হিসাব চেয়েছে দুদক। আরও কয়েজন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে খুব শিগগিরই তলব করা হবে বলে সূত্র জানায়।

এ ছাড়া দুদক আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে অনুসন্ধান বা নিবিড় পর্যবেক্ষণের আওতায় রেখেছে বলে সূত্র জানিয়েছে। এগুলো হচ্ছেÑ পদ্মার শিমুলিয়া-কাঁঠালবাড়ী নৌপথের নিয়মিত পলি অপসারণে অনিয়মের অভিযোগ। ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের আওতায় গুরুত্বপূর্ণ ২৪টি নৌপথ খনন ও ঢাকা নদীবন্দরের আওতাধীন বিভিন্ন নদীতীরের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ অভিযান চলাকালে অবৈধ স্থাপনাসমূহের মালামাল নিলামে বিক্রির ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ। এ ছাড়া যে অভিযোগকে অনুসন্ধানের আওতায় আনা হচ্ছে তা হলো নৌপরিবহন অধিদফতরে মাস্টার ও ড্রাইভারসহ বিভিন্ন পরীক্ষার ফিসের একটা অংশ সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়ে তা কর্মকর্তাদের ভাগবাটোয়ারা করে নেওয়া।

সর্বশেষ গত ২ সেপ্টেম্বর নৌ অধিদফতরের প্রধান কার্যালয়ে গ্রেফতার হন ঢাকা (সদরঘাট) কার্যালয়ের শিপ সার্ভেয়ার মীর্জা সাইফুর রহমান।
দুদকের দাবি, একটি নৌযানের বিশেষ সার্ভে বাবদ দুই লাখ টাকা ঘুষ গ্রহণকালে তাকে হাতেনাতে গ্রেফতার করা হয়। এ কর্মকর্তা নৌযানের সার্ভে ও নিবন্ধন ছাড়াও অভ্যন্তরীণ জাহাজের ড্রাইভার ও সমুদ্রগামী জাহাজের নাবিক পরীক্ষা কমিটিরও সদস্য ছিলেন। বর্তমানে তিনি কারাবন্দি আছেন।

সূত্র জানায়, নৌ অধিদফতরের সদরঘাটের পাশাপাশি নারায়ণগঞ্জ ও খুলনা কার্যালয়ের শিপ সার্ভেয়াররাও সক্ষমতার দ্বিগুণ অর্থাৎ দিনে অন্তত ১০টি নৌযান সার্ভে করেন এবং প্রকৃতপক্ষে নৌযান পরিদর্শন না করেই ফিটনেস সনদ দেন। এ ক্ষেত্রে অনৈতিক লেনদেনেরও অভিযোগ রয়েছে।

মীর্জা সাইফুর রহমানের গ্রেফতারের দিন (২ সেপ্টেম্বর) দুদক থেকে চিঠি পাঠিয়ে একই অধিদফতরের কন্ট্রোলার অব মেরিটাইম এক্সামিনেশন বা সিএমই (চলতি দায়িত্বে) ক্যাপ্টেন গিয়াস উদ্দিন আহমেদকে সম্পত্তির হিসাবসহ তলব করা হয়। এর কয়েক মাস আগে দুদকে তলব করা হয় এনএমআই’র অধ্যক্ষ ও নৌবাণিজ্য দফতরের খÐকালীন শিপ সার্ভেয়ার ক্যাপ্টেন ফয়সাল আজিমকে।

দুদকের চিঠিতে তার বিরুদ্ধে বহু অভিযোগের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে একটি প্রতিষ্ঠানের প্রধান (এনএমআই’র অধ্যক্ষ) হয়ে তিনি বিদেশ যাওয়ার জন্য ছুটি নিয়ে বিধিবহিভর্‚তভাবে একটি বেসরকারি জাহাজে কয়েক মাস চাকরি করেছেন। এ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর অনুসন্ধান এখনও চলছে।

২০১৮ সালের ১২ এপ্রিল রাজধানীর একটি চাইনিজ রেস্তোরাঁ থেকে নৌ অধিদফতরের তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্বে) ড. এস এম নাজমুল হককে গ্রেফতার করে দুদক। এর ৯ মাস আগে ২০১৭ সালের ১৮ জুলাই মতিঝিলে অধিদফতরের প্রধান কার্যালয় থেকে গ্রেফতার করা হয় তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী এ কে এম ফখরুল ইসলামকে। দুজনকেই পৃথক দুটি জাহাজের নকশা অনুমোদনে ঘুষ বাবদ পাঁচ লাখ টাকা গ্রহণকালে আটক করা হয় বলে দুদক দাবি করেছিল। বর্তমানে দুই কর্মকর্তাই জামিনে মুক্ত আছেন এবং সাময়িক বরখাস্ত আদেশ বহাল থাকায় নিজ নিজ পদে ফিরতে পারেননি।

সূত্রমতে, মতিঝিলের বিআইডব্লিউটিএ ভবনে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকে ‘বিআইডব্লিউটিএ কর্মচারী কল্যাণ তহবিল’ ও ‘বিআইডব্লিউটিএ শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়ন’ নামে খোলা আলাদা দুটি হিসাব থেকে মোট ২৫ লাখ টাকা তুলে আত্মসাৎ করা হয়েছে।
এ অভিযোগে বিআইডব্লিউটিএর সিবিএ সভাপতি আবুল হোসেন, কার্যকরী সভাপতি সরোয়ার হোসাইন ও কোষাধ্যক্ষ নাজমুল কবিরকে নোটিস পাঠিয়ে গত ২ সেপ্টেম্বর থেকে কয়েক দফা দুদকে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

ব্যাংক স্টেটমেন্টে দেখা যায়, দুটি হিসাবের ২৫ লাখ টাকার মধ্যে কর্মচারী কল্যাণ তহবিলের সাড়ে ১২ লাখ টাকা তোলা হয়েছে কোষাধ্যক্ষ নাজমুল কবির ও সিবিএর সহ-সভাপতি আখতার হোসেনের স্বাক্ষরে। এ বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আখতার হোসেনকেও খুব শিগগির তলব ও তার সম্পদের হিসাব চাওয়া হবে বলে সূত্র জানায়।

অন্যদিকে নাব্য সংকটের কারণে ঈদুল আজহার আগে পদ্মার শিমুলিয়া-কাঁঠালবাড়ী নৌপথে কয়েক দফা ফেরি ও লঞ্চ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। অভিযোগ উঠেছে নৌপথটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর খনন ও নিয়মিত পলি অপসারণ যথাযথভাবে না হওয়ায় মাঝেমধ্যে এমন সংকট সৃষ্টি হচ্ছে। দুদক এ বিষয়টির ওপর নিবিড় পর্যবেক্ষণ চালাচ্ছে।

একইভাবে নৌযান মালিক ও শ্রমিকসহ বিভিন্ন মহলের অভিযোগের বরাত দিয়ে গণমাধ্যমসমূহে নেতিবাচক সংবাদ প্রকাশিত হওয়ায় বিআইডব্লিউটিএর ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের আওতায় ২৪টি নৌপথ খনন কাজের ওপরও অপ্রকাশ্যে কঠোর নজরদারি করছে দুদক।

এ ছাড়া সম্প্রতি ঢাকা নদীবন্দরের আওতায় বুড়িগঙ্গা ও তুরাগসহ বিভিন্ন নদী ও নদীতীরের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ অভিযান সরকারের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করলেও নিলাম বিক্রির ক্ষেত্রে নানা অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে।

সূত্রমতে, অভিযান চলাকালে উচ্ছেদকৃত অবৈধ স্থাপনাসমূহ বাজারমূল্যের চেয়ে অনেক কম দরে বিক্রি করা হয়েছে। বিআইডব্লিউটিএর বন্দর বিভাগের একজন যুগ্ম পরিচালকের পছন্দের ব্যক্তিদের কাছেই অধিকাংশ নিলাম বিক্রি করা হয়েছে এবং এ প্রক্রিয়ায় ওই কর্মকর্তা আর্থিক সুবিধা নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দুদক এ বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে অনুসন্ধান করছে।

এ বিষয়ে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আবদুস সামাদ সময়ের আলোকে বলেন, দুদক তাদের কাজ করছে। মন্ত্রণালয়কে তারা এ বিষয়ে অবহিত করেনি। তবে নৌ খাতের কোনো সংস্থাতেই যাতে কোনো দুর্নীতি না থাকে সে জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের বিষয়টি সবাইকে জানিয়ে দিয়ে স্বচ্ছতা শতভাগ নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     এই বিভাগের আরও খবর