October 26, 2020, 12:55 am

জিকে শামীমের রিমান্ডে আতঙ্কে গণপূর্তের প্রকৌশলীরা

ডেক্স রিপোর্ট:চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজির অভিযোগে বিপুল পরিমাণ অর্থ, অস্ত্র ও মাদকসহ গ্রেফতার যুবলীগ নেতা পরিচয়ধারী ঠিকাদার জিকে শামীম ১০ দিনের রিমান্ডে যাওয়ার পর আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন গণপূর্ত অধিদফতরের সাবেক ও বর্তমান অনেক প্রকৌশলী। বিশেষ করে শামীমের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স জিকে বিল্ডার্সকে ঘুষের বিনিময়ে কাজ পাইয়ে দেওয়া, বিভিন্ন অজুহাতে প্রকল্পের ব্যয় বাড়ানো ও ঠিকমতো কাজ না করার পরও কমিশনের বিনিময়ে বিল পরিশোধ করে দেওয়ার অভিযোগ থাকা প্রকৌশলীরা বেশি আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। তালিকায় রয়েছেন গণপূর্তের বেশ কয়েকজন সাবেক প্রধান প্রকৌশলী ও অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী এবং বর্তমান একাধিক নির্বাহী, তত্ত্বাবধায়ক ও অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী।
সংশ্লিষ্টরা জানান, আতঙ্কে গণপূর্তের ঢাকা মেট্রোর অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী গত দুই দিন ধরে অফিসই করছেন না। অনেকে ফোন বন্ধ করে রেখেছেন, অনেকে অপরিচিত নম্বরের ফোন ধরছেন না। সূত্র জানায়, বর্তমানে জিকে শামীমের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জিকেবি অ্যান্ড প্রাইভেট লিমিটেড গণপূর্ত অধিদফতরের অধীনে সচিবালয়, র‌্যাব হেড কোয়ার্টার, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল, পঙ্গু হাসপাতালসহ বড় বড় ১৭টি প্রকল্পের প্রায় তিন হাজার কোটি টাকার ঠিকাদারির কাজ করছে।
এর মধ্যে বেশ কয়েকটি প্রকল্প প্রায় শেষ হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ৪০০ কোটি টাকার সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল এবং প্রায় ৩৫০ কোটি টাকার পঙ্গু হাসপাতালের কাজ। এ ছাড়া বড় প্রকল্পের মধ্যে ৫০০ কোটি টাকার কাজ র‌্যাব হেডকোয়ার্টার ও সচিবালয়ে ১৫০ কোটি টাকার অর্থ মন্ত্রণালয় ভবন নির্মাণও প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। সচিবালয়ে ১৫০ কোটি টাকায় কেবিনেট ভবনে নির্মাণকাজ সবেমাত্র শুরু হয়েছে। আর ৪০০ কোটি টাকার এনবিআর ভবন এবং বেইলি রোডে ৩০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প ছাড়াও পার্বত্য চট্টগ্রাম ভবন, মিনিস্টার্স হোস্টেল, নিউরো সায়েন্স ও বিজ্ঞান জাদুঘর প্রকল্প রয়েছে।
গণপূর্ত অধিদফতরের প্রকৌশলীরা জানান, জিকে শামীম গ্রেফতার হওয়ার পর সচিবালয়ে কেবিনেট ভবনসহ জিকেবির বেশিরভাগ প্রকল্পের কাজই সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে। তা ছাড়া তার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ হওয়ায় এই উন্নয়ন প্রকল্পগুলো যথাসময়ে বাস্তবায়ন হওয়া নিয়ে সংশয়ে রয়েছেন তারা।
সংশ্লিষ্টরা জানান, জিকে শামীম পুলিশি রিমান্ডে যাওয়ার পর প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত নির্বাহী প্রকৌশলী থেকে শুরু করে প্রধান প্রকৌশলী ও অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীরা পর্যন্ত আতঙ্কে রয়েছেন। যারা তার কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা কমিশন নিয়েছেন তাদের নাম বলে দিতে পারে এই ভয়ে। তা ছাড়া গত দুদিনে কয়েকটি গণমাধ্যমে জিকে শামীমকে জড়িয়ে কয়েকজন সাবেক প্রধান ও অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীকে জড়িয়ে সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পর আতঙ্ক আরও বেড়ে গেছে।
বর্তমান ও সাবেক প্রকৌশলীরা বিল পরিশোধের সময় জিকেবির কাছ থেকে পদমর্যাদা ভেদে ৫-১০ শতাংশ ঘুষ নিতেন বলে জানা গেছে। শেরেবাংলা নগর এলাকার একজন নির্বাহী প্রকৌশলী ও একজন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, সচিবালয় ও নগরের দায়িত্বে থাকা নির্বাহী প্রকৌশলী এবং ঢাকার অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীসহ বেশ কয়েকজন প্রকৌশলী জিকে শামীমের প্রতিষ্ঠান থেকে কোটি কোটি টাকা কমিশন পেতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া জিকে শামীমের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সাবেক একাধিক প্রকৌশলীও গোয়েন্দা নজরদারিতে রয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে। শামীমের টাকার ভাগ যেত পূর্ত মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার পকেটেও।
অভিযোগ রয়েছে, মেসার্স জিকে বিল্ডার্স তাদের বাগিয়ে নেওয়া বেশিরভাগ প্রকল্পেরই ব্যয় ও সময় বাড়াত অবিশ্বাস্যভাবে। আর এ কাজে তাকে সহায়তা করতেন গণপূর্তেরই সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা। ব্যয় বাড়লে প্রকৌশলীদের কমিশনও বাড়ত। সূত্র জানায়, ২০০৮ সালের ২৪ নভেম্বর একনেক বৈঠকে সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে ‘জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ভবন নির্মাণ’ শীর্ষক প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়। এর আওতায় ১৪১ কোটি ৩৬ লাখ টাকা ব্যয়ে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে ২০ তলাবিশিষ্ট রাজস্ব বোর্ড ভবন নির্মাণ করার কথা ছিল। পরে ভবন ১২ তলা করার সিদ্ধান্ত হলেও জিকে বিল্ডার্স প্রকল্পে ব্যয় বাড়িয়ে করে ৪৯৫ কোটি ১৮ লাখ টাকা। অর্থাৎ প্রকল্পের কাজ কমলেও ব্যয় বেড়ে যায় ৩৫৪ কোটি টাকা।

একইভাবে ২০১৩ সালে শুরু হওয়া ‘জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান (নিটোর) সম্প্রসারণ’ শীর্ষক প্রকল্পের ব্যয়ও বাড়ায় জিকে বিল্ডার্স। প্রকল্পটি শুরুর সময় ৩৩৬ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হলেও শেষ হয় ৫০০ কোটি টাকায়। ২০১৮ সালে শুরু হয় ‘র‌্যাব ফোর্সেস সদর দফতর নির্মাণ’ প্রকল্পের আওতায় ‘কনস্ট্রাকশন অব র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন হেডকোয়ার্টার্স কমপ্লেক্স আশকোনা, উত্তরা, ঢাকা’ শীর্ষক প্রকল্পের কাজ। এ প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৯৫ কোটি ১০ লাখ টাকা। ২০২১ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও বর্তমান অবস্থা বিবেচনায় এই প্রকল্পেও ব্যয় বেড়ে যাওয়ার শঙ্কায় সংশ্লিষ্টরা।
তবে গণপূর্ত অধিদফতরের সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের দাবি উম্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে নিয়ম মেনেই সব কাজ পেয়েছে জিকেবি। ইজিপির কারণে অনিয়মের কোনো সুযোগ নেই। জিকে শামীমের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জিকে বিল্ডার্সের সুপারভাইজার মোহাম্মদ রিপন দাবি করেন তাদের প্রতিষ্ঠান সব কাজ মানসম্মতভাবে করে বলেই কাজ পায়। তাদের সব কাজ নিট অ্যান্ড ক্লিন।
জিকে শামীম সরকারি কাজ পেতে বিপুল অঙ্কের ঘুষ দিয়েছেন, এমন অভিযোগ প্রসঙ্গে সোমবার সচিবালয়ে এক প্রশ্নের জবাবে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘আপনারা একটু বের করুন কাদের কাদের ঘুষ দিয়েছে। কেউ বসে নেই। সরকারের পক্ষ থেকে আঁটঘাট বেঁধেই নেমেছি, এখানে কোনো প্রকার আপস নেই।’ গণমাধ্যমে এসব বিষয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করাও দায়িত্বের মধ্যে আসে মন্তব্য করেন ওবায়দুল কাদের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     এই বিভাগের আরও খবর