October 21, 2020, 1:31 am

ফেসবুক পোস্ট নিয়ে গুজবে ভোলা রণক্ষেত্র

পুলিশ-বিক্ষোভকারী সংঘর্ষে নিহত ৪, আহত ৫০ : চারজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক

বিজিবি, কোস্টগার্ড ও র‌্যাব মোতায়েনভোলার বোরহানউদ্দিনে এক হিন্দু তরুণের ফেসবুক আইডি ‘হ্যাক করে অবমাননাকর’ বক্তব্য ছড়ানোর পর ‘মুসলিম তাওহিদি জনতা’র ব্যানারে সমাবেশ থেকে পুলিশের সঙ্গে সংঘাতে চারজন নিহত হয়েছে। এ ঘটনায় আহত হয়েছে অর্ধশতাধিক। ফেসবুকের মেসেঞ্জারে ধর্ম নিয়ে কটূক্তির অভিযোগে শনিবার বিপ্লব চন্দ্র শুভ নামে এক যুবককে আটক করে বোরহানউদ্দিন থানা পুলিশ। এ ঘটনার জেরে রোববার সকাল ১০টায় স্থানীয়রা একত্রিত হয়ে বোরহানউদ্দিন থানা ঘেরাও করলে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ বাধে।

নিহতরা হচ্ছে- মাহফুজ পাটোয়ারী, মিজানুর রহমান, মো. শাহিন ও মাহবুব পাটোয়ারী। এছাড়া সাংবাদিক, ২০ পুলিশসহ শতাধিক লোক আহত হয়েছে। বোরবার সকাল সাড়ে ১০টায় বোরহানউদ্দিন পৌর এলাকার ঈদগাহ মাঠে এলাকাবাসীর বিক্ষোভ সমাবেশে এ ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিজিবি, র‌্যাব, কোস্ট গার্ড ও অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। এ ঘটনায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। বর্তমানে বোরহানউদ্দিনে পরিস্থিতি থমথমে রয়েছে। এলাকায় মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে।

স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ জানায়, শুক্রবার বিকালে বিপ্লব চন্দ্র শুভর নিজের নাম ও ছবিসম্বলিত ফেসবুক আইডি হ্যাক করে ইসলাম ধর্ম অবমাননাকর কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য তার কয়েকজন ফেসবুক বন্ধুর কাছে মেসেজ পাঠানো হয়। এক পর্যায়ে কয়েকটি আইডি থেকে মেসেজগুলোর স্ক্রিন শট নিয়ে ফেসবুকে কয়েকজন প্রতিবাদ জানালে বিষয়টি সবার নজরে আসে। এমনকি বিষয়টি নিয়ে ফেসবুকে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। এ অবস্থায় সন্ধ্যার পর বিপ্লব চন্দ্র বোরহানউদ্দিন থানায় আইডি হ্যাক হয়েছে মর্মে জিডি করতে এলে থানা পুলিশ বিষয়টি তদন্ত ও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য বিপ্লব চন্দ্রকে তাদের হেফাজতে রাখে। বিপ্লব চন্দ্র শুভ বোরহানউদ্দিন উপজেলার কাচিয়া ইউনিয়নের চন্দ্রমোহন বৈদ্যের ছেলে। সে ডিগ্রি পাস।

পরে এ ঘটনা ছড়িয়ে পড়লে এর প্রতিবাদে বোরহানউদ্দিনের কুঞ্জেরহাট বাজারে এলাকাবাসী তাওহিদী জনতার ব্যানারে মানববন্ধন করে এবং থানার সামনে বিক্ষোভ মিছিল করে। এ সময় তারা ঘটনার সত্যতা যাচাই করে বিপ্লব চন্দ্রের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করে।

বোরহানউদ্দিন থানার ওসি মো. এনামুল হক জানান, গত রাতে বিপ্লব চন্দ্র শুভ নিজের ইচ্ছায় ওই যুবক আমাদের কাছে এসেছে তার ফেসবুক হ্যাক হয়েছে বলে জিডি করতে। সে জানায়, তার কাছ থেকে একটি মোবাইল থেকেও চাঁদা চেয়েছে। ট্র্যাকিং করে শরিফ ওরফে শাকিলকে কলাপাড়া থেকে আটক করে বোরহানউদ্দিন এনে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তাকে ছাড়াও শাকিল নামে আরও এক যুবককে আটক করা হয়। কিন্তু পরে বোরহানউদ্দিন উপজেলার তাওহিদী জনতার ব্যানারে এলাকাবাসী রোববার বেলা ১১টায় বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশের আয়োজন করে। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে তাওহিদী জনতার ব্যানারে এলাকাবাসী বিপ্লবের শাস্তির দাবিতে ঈদগাহ মাদ্রাসা মাঠে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ সমাবেশ করে। সমাবেশে ভোলা পুলিশ সুপার সরকার মোহাম্মদ কয়সার উপস্থিত ছিলেন। তিনি তখন ওই সমাবেশে বক্তব্য রাখেন।

বেলা পৌনে ১১টার দিকে হঠাৎ করে সমাবেশস্থল থেকে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে পুলিশকে ধাওয়া করলে এসপিসহ পুলিশ সদস্যরা মাদ্রাসার একটি কক্ষে আশ্রয় নেয়। এ সময় পুলিশ শটগানের গুলি ছোড়ে বলে স্থানীয়রা জানায়। এতে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে কিছু লোক পুলিশের এসপি যে রুমে আশ্রয় নেয় সেই রুমেও হামলা চালায়। এ সময় বিক্ষিপ্তভাবে সংঘর্ষ ও ইটপাটকেল নিক্ষেপ চলে। পুলিশ ফাঁকা গুলি ছুড়তে ছুড়তে বের হয়ে আসে বলে পুলিশ সুপার জানান। এলাকাবাসী জানায়, পুলিশের গুলিতে মাহফুজ পাটোয়ারী, মিজান, শাহিন ও মাহবুব নামে চার মুসল্লি নিহত হয়। ২০ পুলিশসহ শতাধিক লোক আহত হয়। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে ভোলা-চরফ্যাশন সড়ক অবরোধ করা হয়। এতে করে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ভোলা সদরে বিক্ষোভ করা হয়। খবর সংগ্রহ করতে গেলে বাংলা টিভির সাংবাদিক জুয়েল সাহা ও জিটিভির ক্যামেরাপারসন জয় দের ক্যামেরা ছিনিয়ে নিয়ে তাদের ব্যাপক মারধর করা হয়।

সরেজমিন দেখা গেছে, বোরহানউদ্দিনের ঈদগাহ মাঠের সামনে রাস্তায় ছোপ ছোপ রক্তের দাগ। বোরহানউদ্দিন হাসপাতালে চলছে স্বজনদের আহাজারি। হাসপাতালের কক্ষে পড়ে রয়েছে কয়েকজনের লাশ। অসংখ্য রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। ভোলা সদর হাসপাতাল ও বরিশালে বহু আহত রোগী গুরুতর অবস্থায় পাঠানো হয়েছে।

এদিকে ভোলা সদর হাসপাতালে নেওয়ার পর আহত দুজনকে ডাক্তার মৃত ঘোষণা করেন। বোরহানউদ্দিন হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. আবুল কালাম আযাদ জানান, নিহত হয়েছে চারজন।
এদিকে বরিশাল ডিআইজি শফিকুল ইসলাম রোববার সন্ধ্যায় বোরহানউদ্দিন থানায় এক প্রেসব্রিফিংয়ে বলেন, বহিরাগতরা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে একটি পক্ষ ঘটনা ঘটিয়েছে। সমাবেশ শেষ পর্যায়ে হাঠৎ হামলা করা হয়। মসজিদে অবমাননা করা হয়। পুলিশের এক সদস্যকে গুলি করা হয়। তাকে সিএমএইচ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। তবে কার গুলিতে আহত করা হয়েছে তা নিশ্চিত বলতে পারেননি। তদন্ত করে বলা যাবে। তিনি আরও জানান, যারাই দোষী তদন্ত করে তাদের বিচারের আওতায় আনা হবে।
বরিশাল বিভাগী কমিশনার ইয়ামিন চৌধুরী জানান, এ ঘটনায় ডিডিএলজি মো. মাহমুদুর রহমানকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। 
ভোলা পুলিশ সুপার বলেন, সমাবেশের শেষ দিকে পুলিশের ওপর ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে হামলা চালানো হয়। এ সময় পুলিশ নিরাপত্তার সঙ্গে ফাঁকা গুলি ছোড়ে। তবে এখন পর্যন্ত কাউকে পুলিশ আটক করেনি। এ ঘটনায় মামলার প্রস্তুতি চলছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     এই বিভাগের আরও খবর