October 28, 2020, 4:45 am

দেশে দুই কোটি গরিবকে নগদ টাকা দেবে সরকার

প্রাণঘাতী করোনার কারণে প্রায় স্থবির পুরো বিশ্বের অর্থনীতি। তালিকার বাইরে নেই বাংলাদেশও। তবে প্রায় দেড় মাসের লকডাউনে এরই মধ্যে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ। এ অবস্থায় এসব প্রান্তিক মানুষকে সরাসরি সহায়তার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। 

উদ্যোগের অংশ হিসেবে দুই কোটি মানুষকে (৫০ লাখ পরিবার; পরিবার প্রতি চারজন ধরে) সরাসরি নগদ টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রতি পরিবার নগদ দুই হাজার ৪০০ টাকা করে পাবে। এজন্য অর্থ মন্ত্রণালয় দু-এক দিনের মধ্যে এক হাজার ২০০ কোটি টাকা ছাড় করবে। আর পুরো বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় তদারক করছে বলে অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে আরও জানা যায়, সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের প্রান্তিক মানুষদের সহায়তা করার ঘোষণা দেন। ওই ঘোষণা অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের তত্ত্বাবধানে অর্থ মন্ত্রণালয় এবং ত্রাণ ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয় কাজ শুরু করে। এ ক্ষেত্রে দেশের গরিব, দুস্থদের চিহ্নিত করতে জেলা, উপজেলা পর্যায়ের চেয়ারম্যান, মেম্বারসহ প্রশাসনের সহায়তা নেওয়া হয়েছে। আর শহর এলাকার জন্য প্রশাসন ও মন্ত্রণালয়গুলো একসঙ্গে কাজ করছে। 

সব মিলিয়ে ৫০ লাখ পরিবারের একটি তালিকা করা হয়েছে। তালিকায় প্রতি পরিবারের সদস্য সংখ্যা ধরা হয়েছে চারজন করে। সেই হিসাবে নগদ প্রণোদনার আওতায় আসছে দুই কোটি প্রান্তিক মানুষ। প্রতি পরিবার মাসে পাবে দুই হাজার ৪০০ টাকার নগদ সহায়তা। প্রতিজনে গড়ে ৬০০ টাকা। প্রণোদনার অর্থ সরাসরি চলে যাবে তাদের মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্টে অথবা নিজের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে। 

প্রথম কিস্তির টাকা আগামী দু-এক দিনের মধ্যে দেওয়া হতে পারে বলে জানা যায়। পরবর্তীতে অবস্থা বিবেচনায় আরেক দফা নগদ প্রণোদনা দেওয়া হতে পারে। এ জন্য অর্থ মন্ত্রণালয় এক হাজার ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। উচ্চ পর্যায় থেকে সবুজ সংকেত পেলে যেকোনো সময় এ অর্থ ছাড় করতে প্রস্তুত রয়েছে মন্ত্রণালয়। প্রথম কিস্তির জন্য ১২০ কোটি টাকা খরচ হবে সরকারের।

সরকার ব্যবসায়ীদের জন্য যেসব প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে তার অর্থ আসবে ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে। তবে দুই কোটি প্রান্তিক মানুষের জন্য এক হাজার ২০০ কোটি টাকার যে নগদ সহায়তা দেওয়া হবে তা আসবে বাজেট খাত থেকে। এ জন্য সরকার ব্যাংক বা বিদেশ থেকে সহায়তাস্বরূপ অর্থ নেবে না। অপ্রত্যাশিত খাত থেকে এ অর্থ ব্যয় হবে।

নগদ সহায়তার অর্থ ছাড় হলে সব মিলিয়ে সাড়ে পাঁচ কোটি মানুষ প্রণোদনার আওতায় আসবে। অর্থ মন্ত্রণালয়, ত্রাণ ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয় এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

এ ব্যাপারে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. হাবিবুর রহমান গণমাধ্যমকে জানান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘোষণা অনুযায়ী খুব শিগগিরই এক হাজার ২০০ কোটি টাকা ছাড় করা হবে। বিষয়টি সরাসরি তদারক করছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। অর্থ মন্ত্রণালয় অর্থ ছাড়সহ অন্যান্য কাজ করবে। 

তিনি জানান, শহর-গ্রাম দুই জায়গায়ই এ প্রণোদনা দেওয়া হবে। তাই আশা করা যায়, প্রান্তিক মানুষরা না খেয়ে থাকবে না। আরও অর্থ ছাড়ের প্রয়োজন হলে অর্থ বিভাগ তা করবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাবে, কৃষকের ব্যাংক হিসাব রয়েছে এক কোটি এক লাখ ৮৬ হাজার ৬০৫টি। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় ৫৬ লাখ ৭০৮টি ব্যাংক হিসাব রয়েছে। এ ছাড়া অতিদরিদ্রদের কর্মসংস্থান কর্মসূচির আওতায় ২৬ লাখ ৬২ হাজার ১৬২, মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য দুই লাখ ৪৭ হাজার ৪৯৭ এবং অন্যান্য সুবিধাভোগীর জন্য ১৮ লাখ ২৩ হাজার ১৬২টি ব্যাংক হিসাব খোলা হয়েছে। 

গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে মোট দুই কোটি পাঁচ লাখ ২০ হাজার ১৩৪টি ব্যাংক হিসাবে জমা ছিল দুই হাজার ৩৫৬ কোটি টাকা। সরকার এসব ব্যাংক হিসাবে সাহায্য নিতে পারে বলে জানা গেছে। এ ছাড়া যাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নেই তাদের বিকাশ, রকেট এবং নগদের মতো মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠানো হবে। এ জন্য প্রান্তিক মানুষদের মোবাইল নম্বরও নেওয়া হয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সরকার যদি নতুন করে আরও প্রণোদনা ঘোষণা করে সে জন্য যাতে অর্থ সংস্থানে সমস্যা না হয় সে ব্যবস্থাও করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। চলতি অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির খরচ না হওয়া অর্থ প্রণোদনার কাজে লাগানো হবে। সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (আরএডিপি) থেকে সাড়ে ১০ হাজার কোটি টাকা বেঁচে যেতে পারে। এ টাকা প্রণোদনা খাতে যোগ হবে। চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে সামগ্রিক ভর্তুকির পরিমাণ নির্ধারিত রয়েছে ৪৩ হাজার ২৩০ কোটি টাকা। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম তলানিতে থাকার কারণে এ খাতে সরকারকে ভর্তুকি দিতে হচ্ছে না। এ ছাড়া বিদ্যুতে ভর্তুকির পরিমাণ কমেছে। এসব টাকাও প্রণোদনার খাতে ব্যয় হবে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, করোনাভাইরাস সংকটের মধ্যে মানবিক সহায়তা হিসেবে এ পর্যন্ত সারা দেশে সাড়ে তিন কোটিরও বেশি মানুষকে ত্রাণ সহায়তা দিয়েছে সরকার। ৬৪ জেলা প্রশাসনের দেওয়া তথ্য মতে, সারা দেশে এ পর্যন্ত প্রায় এক লাখ ২০ হাজার টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বিতরণ করা হয়েছে প্রায় ৯০ হাজার টন। বিতরণকৃত চালে উপকারভোগী পরিবারের সংখ্যা ৭৮ লাখ ৩৭ হাজার ৭৩৫। উপকারভোগী লোকসংখ্যা তিন কোটি ৫০ লাখ ১৯ হাজার ৭২। এই সময়ে সরকার ৫৯ কোটি ৬৫ লাখ নগদ টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। যার মধ্যে নগদ সাহায্য হিসেবে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৪৮ কোটি ৮৩ লাখ ৭২ হাজার টাকা। এতে উপকারভোগী পরিবার সংখ্যা ৪৪ লাখ ৭৮ হাজার এবং উপকারভোগী লোকসংখ্যা দুই কোটি ২৮ লাখ ৮০ হাজার। এর সঙ্গে নতুন করে আরও দুই কোটি মানুষ যুক্ত হচ্ছে। ফলে সব মিলিয়ে উপকারভোগীর সংখ্যা দাঁড়াবে সাড়ে পাঁচ কোটি।

সরকার ওএমএসের মাধ্যমে খোলাবাজারে চালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রি, কোনো ক্ষেত্রে বিনা মূল্যে ত্রাণ সরবরাহ করেছে। এসব ক্ষেত্রে চেয়ারম্যান, মেম্বারসহ আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির বিস্তর অভিযোগ ও গ্রেফতারের ঘটনা ঘটেছে। নগদ অর্থের ক্ষেত্রে যেন এ অবস্থা সৃষ্টি না হয় সে জন্য এবার কোনো মধ্যস্থতাকারী রাখছে না সরকার। নগদ সহায়তার অর্থ প্রান্তিক মানুষের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে সরাসরি দিয়ে দেওয়া হবে।

সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন ও বাংলানিউজ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     এই বিভাগের আরও খবর